শিবের বীর্য্য থেকে সোনা

আর্য্য:- শিবের বীর্য্য থেকে সোনা রূপার উৎপত্তি হয়েছে। 
যত্র যত্রাপতন্মযাং রেতস্তস্য মহাত্মনঃ । 
তানি রূপ্যস্য হেম্নশ্চ ক্ষেত্রাণ্যাসন্মহীপতে ।।
ভাঃ ৮/১২/৩৩
বীর্য্য কিভাবে সোনা হতে পারে? এখানে শাস্ত্র ও প্রত্যক্ষের বিরোধ দেখা যায়। পূর্বমীমাংসা সূত্রে এর সমাধান‌ দেওয়া হয়েছে। বৌদ্ধ রা একসময় আপত্তি করতো বেদ এ অনেক বাক্য দেখা যায় যেগুলিতে প্রত্যক্ষ যা দেখা যায় ও শাস্ত্র বাক্যের বিরোধ দেখা যায় তাই বেদ অপ্রামাণিক। 
শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ পূঃ মীঃ ১/২/২ সূত্রে বৌদ্ধ দের এই আপত্তি উত্থাপন করেছেন। তার উত্তরে জৈমিনী সূত্রে বলা হয়েছে 
অপ্রাপ্তা চ অনুপপত্তিঃ প্রয়োগে হি বিরোধঃ স্যাচ্ছব্দার্থস্ত্বপ্রয়োগভূতস্তস্মাদুপপদ্যেত।। পূঃ মীঃ ১/২/৯ 
অর্থবাদ গুলি স্বার্থে তাৎপর্য্যশূণ্য। “শব্দার্থ তু অপ্রয়োগভূতঃ" যদি অর্থবাদ স্বার্থবোধিত ক্রিয়ার কর্ত্তব্যতা বোঝাতো তাহলে ঐ অর্থবাদ থেকে বীর্য্য থেকে স্বর্ণ উৎপাদন কর্ত্তব্য বোঝাতো। তাহলে দৃষ্ট ও শাস্ত্রের বিরোধ হতো। কিন্তু অর্থবাদের প্রয়োজনীয়তা বিধির প্রশংসা বোঝাতে। তা পূঃ মীঃ ১/২/৭ বিধিনা ত্বেকবাক্যত্বাৎ স্তুত্যর্থেন বিধীনাং স্যুঃ সূত্রে বলা হয়েছে। এই কাহিনীটির তাৎপর্য্য স্বর্ণ ক্ষেত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা রুদ্র তাই স্বর্ণকার রুদ্রের পূজা করে যতটুকু প্রয়োজন সেই পরিমাণ ই স্বর্ণ আহরণ করবেন। 

বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তী টীকায় বলেছেন:- 
তানি ক্ষেত্রাণি রুদ্র দৈবতানি ইত্যতস্তেভ্যো হেমলিপ্সুভিঃ প্রথমং রুদ্রঃ প্রসাদনীয় ইতি ভাবঃ৷৷
মহাদেবের বীর্য্য যেখানে পড়েছিল সেই সব স্থান রুদ্রদেবের অধিকারে। তাই সেইসব স্থান থেকে স্বর্ণ লাভের অভিলাষী ব্যাক্তিরা প্রথমে রুদ্র দেব কে প্রসন্ন করবেন। 
ভাঃ ৮/১২/৩৩ VCT pdf 191
শিবের বীর্য্য সোনা হয়েছে এরকম বলা হয়নি। 
বর্তমানে অবৈধ খনন চালিয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এই ক্ষেত্র শিবের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অধিক খনন করলে শিব রুষ্ট হবেন জেনে যতটা প্রয়োজন ততটা খনন করলে ঠিক আছে। নয়তো অবৈধ খনন কার্য্যের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় আর প্রকৃতির রুদ্র লীলা দেখা যায়। 
শাস্ত্রে ধরনের চার বাক্য থাকে 
মন্ত্র= 
বিধি= যে বাক্য কর্মে প্রবর্তন করে, অজ্ঞাত অর্থের জ্ঞাপক তাকে বিধি বলে। অজ্ঞাত অর্থাৎ অন্য প্রমাণের দ্বারা পূর্বে অপ্রাপ্ত।
অর্থবাদ= যে বাক্য অন্য কোনো বিধিবাক্যের শেষ, বিধিবাক্যের প্রশংসা বা নিন্দা বোঝায় তাকে অর্থবাদ বলে। 
নামধেয়= 

অর্থবাদ তিন প্রকার 
প্রত্যক্ষ আদি অন্য প্রমাণের সাথে বিরোধ থাকলে গুণবাদ। উদা:- আদিত্যো যূপঃ 
প্রমাণান্তর দ্বারা প্রতিপাদিত হলে অনুবাদ 
উদা:- অগ্নির্হিমস্য ভেষজম্ 
প্রমাণান্তরের সাথে বিরোধ ও অন্য প্রমাণান্তরের অভাবে ভূতার্থবাদ 
উদা:- ইন্দ্রো বৃত্রায় বজ্রমুদযচ্ছৎ

আক্ষেপ:- অর্থবাদ বিধিবাক্যের অঙ্গ বা শেষ রূপে পঠিত হয়। অর্থবাদ বিধিবাক্যের প্রশংসা করে কিন্তু এখানে তো কোনো বিধিবাক্য নেই।‌‌ বিশ্বনাথ চক্রবর্ত্তীর টীকা থেকে বিধিবাক্য কল্পনা করে নেওয়া হয়েছে, টীকা থেকে বিধি দেখালে কি করে হবে? 
উত্তর:- অর্থবাদ বাক্য সাধারনত বিধিবাক্যের প্রশংসা বা নিন্দা করে কিন্তু যদি কোথাও বিধিবাক্য না থাকে তবে সেখানে অর্থবাদ বাক্য থেকে যে ফল বা স্তুতি জানা যায় তা যদি অনর্থক হয় তবে বিধির কল্পনা বা অধ্যাহার করতে হয়। শিবের বীর্য্য সোনা রূপার খনিতে পরিনত হয় এই বাক্য কোনো ফল বা বিধি কে বলছেনা কারন যদি বিধি হতো 
"বীর্য্যকে স্বর্নে পরিনত করো" এই বাক্যের কোনো অর্থ হয় না
যদি ফল বোঝাতো 
"কোনো ক্রিয়ার দ্বারা বীর্য্য স্বর্নে পরিনত হয়" এই বাক্যের ও কোনো অর্থ হয় না 
তাই এটি অর্থবাদ বাক্য এবং রাত্রিসত্র ন্যায়ে এখানে বিধিবাক্যের অধ্যাহার বা অনুমান করতে হয়। 
 রাত্রিসত্র ন্যায় কি? জৈমিনী সূত্রে ৪/৩/১৭-১৯ আলোচনা করা হয়েছে অর্থবাদ থাকলেও যদি বিধি না থাকে সেক্ষেত্রে বিধিবাক্যের অধ্যাহার করতে হবে।  
“প্রতিতিষ্ঠন্তি হ বা য এতা রাত্রী রূপযন্তি"
যারা এই রাত্রিসত্র অনুষ্ঠান করে তারা প্রতিষ্ঠিত হয়। 
এখন‌ রাত্রিসত্র করলে কেউ জগতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই এটি অর্থবাদ বাক্য কিন্তু এখানে বিধিবাক্য কোথায়? তার উত্তরে বলা হচ্ছে “অশ্রুতৌ হি অনুমানং স্যাৎ" বিধিবাক্য শ্রুত না হলে তার অনুমান বা অধ্যাহার করতে হবে। 
তেমন 

মীমাংসা দর্শন ভূতনাথ সপ্ততীর্থ পৃ: ৭৮ 
প্রশ্ন:- পুরাণে অর্থবাদ কি করে হয়? অর্থবাদ তো ব্রাহ্মণের অংশ ন্যায়সূত্র ভাষ্যে বলা হয়েছে পরাকৃতি, নিন্দা,  অর্থবাদ ব্রাহ্মণের অংশ। 
উত্তর:- শাস্ত্রবাক্যে শাস্ত্র দৃষ্ট বিরোধ থাকলে সেগুলিকে অর্থবাদ হিসাবে গ্রহণীয়। 
বৌদ্ধ ও নাস্তিক রা বেদ এর বিরুদ্ধে যেসব আপত্তি তুলতো আর্য্য সমাজ ও বর্তমানে পুরাণের বিরুদ্ধে সেরকম আপত্তি তোলে। ঋষিগণ বলেছেন বেদ এ  শাস্ত্রদৃষ্ট বিরোধ থাকলে তা অর্থবাদ। সেক্ষেত্রে তারা ব্রাহ্মণ বাক্য দিয়ে উদাহরণ দিয়েছেন। পুরাণ ও পঞ্চমবেদ তাই পুরাণে এরকম শাস্ত্রদৃষ্ট বিরোধ থাকলে এভাবেই সমাধান করতে হবে। আর্য্যসমাজ তো ব্রাহ্মণ কে বেদ বলে মানেনা। 
যেমন একটা উদাহরণ দিয়ে বলি রামায়ণে যদি শাস্ত্রদৃষ্ট বিরোধ থাকে তাহলে এভাবে সমাধান করতে হবে বলে আমি বালকাণ্ড থেকে একটি শ্লোক নিয়ে দেখালাম। তাহলে অনুরূপ ভাবে উত্তরকাণ্ডের কোনো শ্লোক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও একইভাবে সমাধান করতে হবে। তেমন বেদ এর ই অংশ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, পুরাণ, গাথা নারশংসী। ব্রাহ্মণ অংশে শাস্ত্র দৃষ্ট বিরোধের যেভাবে সমাধান করতে হবে সেই একইভাবে পুরাণ অংশের ও করতে হবে। 
পুরাণে অর্থবাদ বাক্য আছে এটা আমার কথা নয় আচার্য্য দের বাক্য। নারায়ণ পণ্ডিতাচার্য্য নারায়ণীয় গ্রন্থে ৯০/১০ শ্লোকে বলেছেন তামসিক পুরাণের ভগবৎপর নয় যেসব বিধি সেগুলি অর্থবাদ। 

প্রশ্ন:- ভাগবতে অবৈজ্ঞানিক সমস্ত কথা যদি অর্থবাদ হয় তবে শ্রীকৃষ্ণের মৃদভক্ষন ও মা যশোদা কে ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করানো এগুলিও অর্থবাদ
উত্তর:- শ্রীকৃষ্ণের নিজমুখে ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করানো, এক আঙুলে গোবর্দ্ধন পর্বত ধারণ, এই অসমোর্দ্ধ ঐশ্বর্য্য প্রদর্শন লীলাদি অর্থবাদ নয়। এগুলি সিদ্ধ উপদেশ বাক্য বা সিদ্ধার্থ প্রতিপদক বাক্য। 
সিদ্ধ উপদেশ বাক্য কি? যেসব বাক্যে বিধির্লিঙ্‌  ল-কার না থাকলেও স্বতঃ পুরুষার্থ বোঝায় 
যেমন স্বর্গকামী ব্যাক্তি জ্যোতিষ্টোম যজ্ঞ করা উচিত। এখানে বিধির্লিঙ্ ল-কার আছে কর্তব্য বোঝাচ্ছে, তাই বিধিবাক্য । 
ব্রহ্ম সত্য, জ্ঞান ও আনন্দময় এই বাক্য কিছু করা উচিত, কর্তব্য না বললেও সেই ব্রহ্মকে লাভ করা উচিত এই উপদেশ স্বতঃ সিদ্ধ হয়। তাই এটি সিদ্ধ উপদেশ বাক্য। 

সেরকমই শ্রীকৃষ্ণের নিজমুখে ব্রহ্মাণ্ড দর্শন করানো, এক আঙুলে গোবর্দ্ধন পর্বত ধারণ, এই অসমোর্দ্ধ ঐশ্বর্য্য প্রদর্শন লীলাদি সিদ্ধ উপদেশ বাক্য বা সিদ্ধার্থ প্রতিপদক বাক্য।
কারন এই সমস্ত লীলার বর্ণনা বোঝায় যে শ্রীকৃষ্ণের এই রকম অসমোর্দ্ধ ঐশ্বর্য্য আছে, যার সমান বা অধিক ঐশ্বর্য্য অন্য কারো নেই, যার মধ্যে সমস্ত বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড অধিষ্ঠিত, তাই আমাদের তাকে লাভ করা উচিত। এই উপদেশ সিদ্ধ হয়। 
এই বাক্য গুলি বিধি নয় কারন কোনো ক্রিয়ার অনুষ্ঠানের প্রতিপাদক নয়। 
কোনো বিধির শেষভূত বাক্য নয় তাই অর্থবাদ ও বলা যায় না। 

প্রশ্ন:- শিবের বীর্য্য থেকে সোনা উৎপন্ন হয় এটা কেন সিদ্ধ উপদেশ বাক্য হবে না? 
সিদ্ধ উপদেশ বাক্যের লক্ষণ কি তা জানতে হবে।


Comments